মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ও শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন ঘিরে উত্তাল ভারতের রাজধানী দিল্লি। সোমবার (২০ জুলাই) বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এরপরও অবস্থান না ছেড়ে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভোরে জন্তর মন্তরে আশ্রয় পুনর্নির্মাণ করে বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন আন্দোলনকারীরা।
অন্যদিকে, প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’র ব্যানারে মঙ্গলবার কিষাণ ঘাটে আয়োজিত ‘কিসান মহাপঞ্চায়েত’-এ যোগ দিতে আসা হাজারখানেক কৃষককে পাঞ্জাব-হরিয়ানার শম্ভু সীমান্তে ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দিয়েছে পুলিশ। একই সময়ে দিল্লির এই প্রতিবাদ মঞ্চে দাঁড়িয়ে শ্রীনগরের এমপি আগা সৈয়দ রুহুল্লাহ মেহেদিসহ রাজ্যের কয়েকশ লোকের জমায়েতে জম্মু-কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার জোরালো দাবি জানান।
শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ, সীমান্তজুড়ে কৃষকদের অবস্থান এবং কাশ্মীরের সাংবিধানিক অধিকার আদায়ের এই ত্রিমুখী আন্দোলনে উত্তাল দিল্লি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, ত্রিমুখী আন্দোলনের চাপ সামলাতে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার।
ককরোচ জনতা পার্টির অন্দোলন
সোমবার (২০ জুলাই) দিল্লিতে সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সংঘর্ষে অন্তত ১৮০ জন আহত হয়েছেন। ব্যাপক সংঘাত, ক্ষয়ক্ষতি ও প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনড় থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুব সমাজ ও শিক্ষার্থীদের সংগঠন সিজেপি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে জানা যায়, মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভোরের দিকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই মধ্য দিল্লির জন্তর মন্তরে কয়েকশ বিক্ষোভকারী সমবেত হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। আগের দিনের পুলিশি হামলা, লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস এবং তাঁবু ভেঙে দেওয়ার পর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আসবাবপত্র ও মালামাল কুড়িয়ে নিয়ে আন্দোলনকারীরা রাতভর পুনরায় তাদের অস্থায়ী তাঁবু ও আশ্রয়স্থল তৈরির কাজ চালান।
দিল্লি পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সংঘর্ষের পর আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। আহতদের মধ্যে ১১৮ জনেরও বেশি পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী এবং অন্তত ৬০ জন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী রয়েছেন। সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে প্রায় ৭০ জন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
দিল্লি প্রশাসনের দমনপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করছেন বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীরা ও একটিভিস্টরা। এছাড়া দেশটির হাইকোর্টও প্রশাসনকে আন্দোলন দমনে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
তবে দিল্লি ও ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে আসা শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত যন্তর মন্তরের এই অবস্থান কর্মসূচি থেকে তাঁরা একচুলও সরবেন না।
দিল্লি অভিমুখে কৃষকদের পদযাত্রা
প্রস্তাবিত ভারত-যুক্তরাষ্ট্র মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’র ব্যানারে দিল্লিতে আয়োজিত ‘কিসান মহাপঞ্চায়েত’ কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার সময় পাঞ্জাব-হরিয়ানার শম্ভু সীমান্তে হাজারের বেশি কৃষককে আটকে দিয়েছে পুলিশ।
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন বলছে মঙ্গলবার দিল্লির কিষাণ ঘাটে এ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। পাঞ্জাব, হরিয়ানাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা এসব কৃষকদের রুখতে শম্ভু সীমান্ত এলাকায় ঘাগ্গর নদীর ওপর ব্রিজের মুখে ব্যারিকেড দিয়ে পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কৃষক নেতা সারওয়ান সিং পান্ধের হরিয়ানা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, কৃষকদের শান্তিপূর্ণভাবে দিল্লিতে পৌঁছাতে না দেওয়া এবং কিসান মহাপঞ্চায়েতে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখতেই সরকার এ ধরনের অবরোধ সৃষ্টি করেছে। সোমবার (২০ জুলাই) দিল্লিতে সিজেপির সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সহিংসতার রেশ কাটতে না কাটতেই কৃষকদের এ পদযাত্রা সামলাতে দিল্লি পুলিশকে বেগ পেতে হচ্ছে।
কৃষকদের আশঙ্কা ভারত-মার্কিন প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে কম মূল্যের বিদেশী কৃষিপণ্য ও দুগ্ধজাত সামগ্রী দেশের বাজারে সহজলভ্য হয়ে উঠবে, যা স্থানীয় কৃষক, খামারি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেবে। চুক্তির নথি প্রকাশ করে প্রস্তাবিত চুক্তি বাতিল করা এবং কৃষকদের সঙ্গে পরামর্শ না করে কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার দাবিতে তারা অনড় অবস্থান নিয়েছেন।
জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা দাবি
ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদাসহ বিশেষ সাংবিধানিক বিধান পুনর্বহালের দাবিতে সোমবার (২০ জুলাই) রাজধানী দিল্লি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
জম্মু ও কাশ্মীরের একজন সংসদ সদস্য, আগা সৈয়দ রুহুল্লাহ মেহেদি, সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দখলকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদার বিষয়টি উক্ত সাংবিধানিক ধারা পুনর্বহালের থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়।
কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময় শ্রীনগরের ন্যাশনাল কনফারেন্সের এই এমপি এসব কথা বলেন।
সমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় আগা সৈয়দ রুহুল্লাহ মেহেদি বলেন, জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণের সাংবিধানিক অধিকার ও পরিচয় অবশ্যই ফিরিয়ে দিতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারত সরকার কর্তৃক বাতিল করা ৩৭০ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা ছাড়া ন্যায়বিচারের যেকোনো সংগ্রামই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
