Home » বিলুপ্ত করা হচ্ছে র‍্যাব, আসছে নতুন বাহিনী ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’

বিলুপ্ত করা হচ্ছে র‍্যাব, আসছে নতুন বাহিনী ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’

কর্তৃক xVS2UqarHx07
34 ভিউজ

এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন নামে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর একটি খসড়া জনমতের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

 

খসড়ায় র‌্যাবের বিদ্যমান কাঠামোকে আইনি ভিত্তি দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাহিনীটির দায়িত্ব, অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা, মামলা তদন্ত, সদস্যদের শৃঙ্খলা এবং নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খসড়াটি চূড়ান্ত হওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত নিয়ে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। সেখানে অনুমোদন পেলে আইনটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে। নতুন আইন কার্যকর হলে র‌্যাব-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনি ভিত্তি বিলুপ্ত হবে। তবে নতুন বিধিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত আগের কিছু বিধান কার্যকর থাকবে।

 

অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকেও সদস্যদের প্রেষণে এনে এই ইউনিট গঠন করা যাবে। প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ-সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী নির্ধারিত শর্তে কোনো সদস্যকে এই ইউনিটে প্রেষণে নিয়োগ বা অস্থায়ীভাবে সংযুক্ত করা যাবে। প্রেষণে নিয়োগের মেয়াদ ন্যূনতম দুই বছর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

 

খসড়া আইন পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদকদ্রব্য দমন, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা—এসবই এসআরবির দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আদালত, সরকার কিংবা পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) নির্দেশে মামলা দায়ের ও তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।

 

খসড়া অনুযায়ী, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করে এসআরবির সদস্যরা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তার করতে পারবেন। মাদক, অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসী আস্তানা, মানবপাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ কিংবা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা থাকবে বাহিনীটির।

 

এ ছাড়া আদালত, সরকার বা আইজিপির নির্দেশে ফৌজদারি অপরাধের তদন্তও পরিচালনা করতে পারবে এসআরবি। তদন্ত করবেন অন্তত সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তা এবং পুরো প্রক্রিয়ায় ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ রেগুলেশন অনুসরণের বাধ্যবাধকতা থাকবে।

 

সুষ্ঠু তদন্ত পরিচালনার স্বার্থে এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদকক্ষ থাকবে। জব্দ করা মালামাল আদালতের আদেশ বা সরকারের প্রণীত বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে।

 

খসড়া আইনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সংযোজন হলো অভিযোগ প্রতিকার কমিটি। র‌্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নতুন বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ হিসেবে এ কমিটিকে দেখা হচ্ছে।

 

অভিযোগ প্রতিকার কমিটির সভাপতি হবেন এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। সদস্য হিসেবে থাকবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা, পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) এবং মানবাধিকার, আইন বা বিচার প্রশাসনে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকার মনোনীত একজন ব্যক্তি।

 

কমিটি নাগরিকদের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে। প্রয়োজনে পৃথক অনুসন্ধান দল গঠন করতে পারবে এবং অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করতে পারবে। বাহিনীর কার্যক্রমে অবৈধ প্রভাব, হয়রানি বা অনিয়মের অভিযোগও কমিটি পর্যালোচনা করতে পারবে।

 

এ ছাড়া অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ প্রদান করা যাবে। ইউনিটের কার্যক্রমে বিধিবহির্ভূত প্রভাব, পদোন্নতি, পদায়ন, বিভাগীয় শাস্তি, হয়রানি বা অন্যথা আচরণসংক্রান্ত অসন্তোষ নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিতে পারবে কমিটি। ইউনিটের আইনানুগ কার্যক্রমে কোনো ব্যক্তি বা সত্তা বিধিবহির্ভূত ও অযাচিত প্রভাব বিস্তার করলে এবং অনুসন্ধানে তা প্রমাণিত হলে, ওই ব্যক্তি বা সত্তার দায়-দায়িত্ব নিরূপণপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করতে পারবে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি।

 

খসড়া আইনে সদস্যদের শৃঙ্খলা ও আচরণবিধিও বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে মাদকাসক্ত থাকা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য করা, দায়িত্বে অবহেলা, বেআইনিভাবে অর্থ আদায়, সরকারি অস্ত্র বা সরঞ্জামের অপব্যবহার, অপরাধীকে পালাতে সহায়তা করা কিংবা জুয়া ও অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার মতো অপরাধের জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে নিজ নিজ বাহিনীতে ফেরত পাঠিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

 

খসড়া অনুযায়ী, এসআরবির কোনো সদস্য শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা অন্য কোনো ফৌজদারি অপরাধ করে পলাতক হলে ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক তাকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেবেন। এ জন্য পলাতক সদস্যের স্থায়ী বা বর্তমান বাসস্থানের সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে অনুরোধ জানানো হবে। ওই অনুরোধকে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক জারিকৃত পরোয়ানার সমতুল্য হিসেবে গণ্য করে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পলাতক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়নে সোপর্দ করবেন।

 

খসড়া অনুযায়ী, নতুন আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র‌্যাবের সব সম্পদ, জনবল, তহবিল, দায়-দায়িত্ব, চলমান মামলা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং বিদ্যমান চুক্তি এসআরবির অধীনে স্থানান্তরিত হবে। নতুন বিধিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত র‌্যাবের বিদ্যমান বিভাগীয় কার্যবিধিও প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ কার্যকর থাকবে।

 

খসড়া আইন বিশ্লেষণে দেখা যায়, র‌্যাব প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সময়ে বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন নামে বাহিনী গঠনের উদ্যোগকে সরকারের একটি কাঠামোগত সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বাহিনীর নাম ও সাংগঠনিক কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও অভিযান পরিচালনা, গ্রেপ্তার, তল্লাশি এবং তদন্তের মৌলিক ক্ষমতার বড় অংশই বহাল রাখা হয়েছে। নতুন সংযোজন হিসেবে যুক্ত হয়েছে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি এবং সদস্যদের জন্য আরও স্পষ্ট শৃঙ্খলাবিধি।

০ মন্তব্য

You may also like

মতামত দিন