Home » এইচএসসি প্রশ্নফাঁসের ডিজিটাল হাট, গোয়েন্দা নজরদারিতে ১৮ আইডি।

এইচএসসি প্রশ্নফাঁসের ডিজিটাল হাট, গোয়েন্দা নজরদারিতে ১৮ আইডি।

কর্তৃক ajkermeherpur
10 ভিউজ

এইচএসসি প্রশ্নফাঁসের ডিজিটাল হাট, গোয়েন্দা নজরদারিতে ১৮ আইডি।

পরীক্ষা শুরুর আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। যে সময় পরীক্ষার্থীদের টেবিলে বসে চূড়ান্ত রিভিশন দেওয়ার কথা, ঠিক তখন গভীর রাতে হাজারো শিক্ষার্থীর চোখ জ্বলজ্বল করছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। তারা বুঁদ হয়ে আছে বিভিন্ন টেলিগ্রাম চ্যানেল কিংবা ফেসবুক গ্রুপে। এসব গ্রুপ থেকে তাদের দেওয়া হয় প্রশ্ন দেওয়ার টোপ।

চলমান এইচএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বসেছে প্রশ্ন ফাঁসের এই ‘ডিজিটাল হাট’। চক্রটি এবার ফেসবুকের পাশাপাশি তৎপর অ্যান্ড-টু-অ্যান্ড এনক্রিপ্টেড টেলিগ্রাম চ্যানেলে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কাছ থেকে প্রশ্ন ফাঁস ও বিক্রির গুজব ছড়ানো এমন কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপ ও টেলিগ্রাম চ্যানেলের তথ্য সংগ্রহ করেছে এশিয়া পোস্ট। এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে অর্থ আদায়ের জন্য বিভিন্ন পোস্ট দেওয়া হয়। এমন পোস্ট দেওয়া ১৮টি অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো এখন সিআইডির নজরদারিতে রয়েছে।

এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতি রাতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। পরীক্ষার্থীদের মানসিক চাপকে পুঁজি করে এই কারবার চালায় অসাধু ব্যক্তিরা। বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষা এলেই তৎপর হয়ে উঠে চক্রটি।

প্রতারণার ফাঁদ

‘এইচএসসি প্রশ্ন ফাঁস-২০২৬’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ৩ হাজার ৭৮৮ জন। এটি খোলা হয় গত ফেব্রুারির শেষদিকে। তখন নাম ছিল ‘এসএসসি পরীক্ষা প্রশ্ন ফাঁস-২০২৬’। গত ১১ মে নাম পরিবর্তন করা হয়।

প্রিয়ম প্রিয়ম নামের একটি আইডি দিয়ে গ্রুপটি খোলা হয়েছে। এশিয়া পোস্টের পক্ষ থেকে পরীক্ষার্থী সেজে ওই আইডির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। আগামী ১২ জুলাই হিসাববিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্ন চাওয়া হলে ইতিবাচক সাড়া মেলে। দাবি করা হয় ৫ হাজার ৬০০ টাকা।আগাম এতো টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তিনি ৫০০ টাকার বিনিময়ে একটি প্রশ্ন দিতে রাজি হন। টাকা পাঠাতে নগদের একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর (০১৯২৩***৫৭৫) দেন।

পরে ওই ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তের জন্য তার দেওয়া মোবাইল নম্বর ধরে অনুসন্ধান শুরু করে এশিয়া পোস্ট। এতে দেখা যায়, নম্বরটি সুনামগঞ্জের বাসিন্দা ৫৪ বছরের কবীন্দ্র চন্দ্র দাসের নামে রেজিস্ট্রেশন করা। পরে কবীন্দ্র চন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তার কোনো নগদ অ্যাকাউন্ট নেই। আর এই নম্বরটি তার নামে হলেও তার ছেলে ব্যবহার করেন।

যেভাবে পাতা হয় প্রতারণার ফাঁদ

‘এইচএসসি প্রশ্ন ফাঁস-২০২৬’ গ্রুপে পোস্ট দেওয়া সাতটি আইডি শনাক্ত করেছে সিআইডি। তাদের একজন আহমেদ রাহাত খান। তিনি গ্রুপে পোস্ট দিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে নিয়ে যান। এরপর প্রশ্ন দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছে টাকা দাবি করা হয়।

একই গ্রুপে ‘প্রশ্ন পেয়েছি’ দাবি করে অন্য শিক্ষার্থীদের প্রলুব্ধ করা হয় ডারিয়া আক্তার নামের একটি আইডি থেকে। জান্নাতুল ইসলাম, তানভীর চৌধুরী, রোমান ভাই এবং পিসফুলগ্রাপিফ্রুট; এমন কয়েকটি নামের আইডিও প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হয়।অন্তত চারটি ফেসবুক গ্রুপ এমন প্রতারণায় সরাসরি জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে ‘এইচএসসি ব্যাচ ২০২৬ হেল্প লাইন’ গ্রুপে পোস্ট দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া তিনটি আইডি শনাক্ত করেছে সিআইডি।

২০২৪ সালে খোলা এই গ্রুপে আগে পরীক্ষার সাজেশন দেওয়া হতো। এরপর ছয়বার নাম পরিবর্তন করে গত ৩০ এপ্রিল নাম রাখা হয় ‘এইচএসসি ব্যাচ ২০২৬ হেল্প লাইন’।

গ্রুপটি পরিচালনা করে ‘ব্যতিক্রম অনলাইন কোচিং সেন্টার’ ও ‘টার্গেট এ প্লাস কোচিং সেন্টার’ নামের দুটি আইডি। এখান থেকে খুরশিদ বিন, প্যাশনিয়া টেলেম্মা৭৩১ ও সাদিকুল ইসলাম নামের তিনটি আইডি প্রশ্ন দেওয়ার নামে নিয়মিত প্রচারণা চালাচ্ছে।এছাড়া ‘রেজাল্ট চেঞ্জ’ গ্রুপ থেকে রোমান ভাই, ‘সকল বোর্ড প্রশ্ন ফাঁস’ গ্রুপ থেকে আবিদ ভাই এবং ‘এইচএসসি ব্যাচ-২০২৬’ নামের আরেকটি গ্রুপ থেকে রিফাত খান নামের আইডি দিয়ে প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়ানো হয়।

ফেসবুকের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিতে এসেছে ছয়টি টেলিগ্রাম চ্যানেল। এগুলো হলো— ‘এইচএসসি ২০২৬ সকল প্রশ্ন’, ‘এইচএসসি ২৬’ (দুটি চ্যানেল), ‘ফ্রি প্রশ্ন’, ‘এইচএসসি ২০২৬ সকল বোর্ড প্রশ্ন’ এবং ‘এইচএসসি জেনুইন কোয়েশচেনস (২০২৬)’। এসব চ্যানেল থেকেও প্রশ্ন ফাঁস ও বিক্রির গুজব ছড়ানো হয়।ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আক্তারুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এইচএইসসির প্রশ্নফাঁস বা এ জাতীয় গুজব ছড়ানোর তেমন কোনো খবর পাইনি। প্রশাসন এটা নিয়ে তৎপর রয়েছে। বিশেষ করে সিআইডি কাজ করছে। আমরা সুষ্ঠুভাবে বাকি পরীক্ষাগুলো নিতে পারবো বলে আশাবাদী।’

যা বলছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁসের গুজব এখন শুধু একটি প্রতারণা নয়, এটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করার জন্য দায়ী একটি সাইবার অপরাধ। ফেসবুক, টেলিগ্রাম বা অন্য কোনো মাধ্যমে প্রশ্ন বিক্রির দাবি করা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য আর্থিক প্রতারণার ফাঁদ।’

তার মতে, সরকারের উচিত সাইবার নজরদারি জোরদার করা এবং ভুয়া প্রশ্ন বিক্রির সঙ্গে জড়িত অ্যাকাউন্ট, গ্রুপ ও চ্যানেলগুলো দ্রুত শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।

ডিজিটাল ফরেনসিকের মাধ্যমে অপরাধীদের চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এসব কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের ওপরও জোর দেন তিনি।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে। কোনো ধরনের প্রশ্ন ফাঁসের পোস্ট, লিংক বা বার্তা বিশ্বাস বা শেয়ার না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। গুজব ছড়ানো যেমন অপরাধ, তেমনি এটিকে উৎসাহ দেওয়াও অপরাধকে শক্তিশালী করে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় সচেতনতা, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা; এই তিনটির সমন্বয়ই সবচেয়ে কার্যকর পথ।’

সিআইডির বক্তব্য

সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান আলি আকবর খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সাইবার পেট্রোলিং টিম সার্বক্ষণিকভাবে এই গুজব ছড়ানো প্ল্যাটফর্মগুলো পর্যবেক্ষণ করে। আমরা কোনো ফেসবুক গ্রুপ বা টেলিগ্রাম চ্যানেলের খোঁজ পেলে সঙ্গে সঙ্গে বিটিআরটিসহ সংশ্লিষ্ট শাখায় জানিয়ে দেই, যাতে এগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই প্ল্যাটফর্মগুলো যারা পরিচালনা করেন তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার অভিযান চলমান রয়েছে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও আমরা সব সময় সাইবার অপরাধীদের ব্যাপারে সোচ্চার।

০ মন্তব্য

You may also like

মতামত দিন