Home » ফুটবলের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী, অর্থনীতির খেলায় এগিয়ে কে— ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা?

ফুটবলের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী, অর্থনীতির খেলায় এগিয়ে কে— ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা?

কর্তৃক xVS2UqarHx07
11 ভিউজ

বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম রাউন্ডের খেলা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ এখন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাঠে। নিজেদের প্রথম ম্যাচে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল প্রত্যাশিত জয় পায়নি; মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে মাঠ ছাড়তে হয়েছে সেলেসাওদের। অপরদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই দেখিয়েছে নিজেদের শক্তি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের দাপুটে জয় তুলে নিয়েছে তারা, যেখানে অধিনায়ক লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিক গোল বিশ্বকাপের শুরুতেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

 

মাঠের খেলায় আপাতত এগিয়ে আর্জেন্টিনা। বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যেও তাই নতুন করে উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে আকাশি-সাদা শিবিরে। কিন্তু ফুটবলের আবেগের বাইরে অর্থনীতির স্কোরবোর্ডে চোখ রাখলে ভিন্ন এক চিত্র দেখা যায়। সেখানে দীর্ঘদিন ধরেই আর্জেন্টিনাকে পিছনে ফেলে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ব্রাজিল।

 

 

আমদানিতে ব্রাজিলের শক্ত অবস্থান

 

 

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৬৭ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে শুধু ব্রাজিল থেকেই এসেছে প্রায় ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশের উৎস ব্রাজিল। এই হিসাবে দেশটি বাংলাদেশের ষষ্ঠ বৃহত্তম আমদানি উৎস।

 

অপরদিকে একই সময়ে আর্জেন্টিনা থেকে আমদানি হয়েছে ৭৮৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। মোট আমদানিতে যার অংশ মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ। আমদানিকারক দেশগুলোর তালিকায় আর্জেন্টিনার অবস্থান ১৭তম। অর্থাৎ বাংলাদেশ আর্জেন্টিনা থেকে যত পণ্য কিনেছে, ব্রাজিল থেকে কিনেছে তারও প্রায় তিনগুণ বেশি।

 

এর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের শিল্প ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত কিছু গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের চাহিদা। ব্রাজিল থেকে বাংলাদেশে আসে অপরিশোধিত চিনি, তুলা, সয়াবিন, ভুট্টা ও অন্যান্য কৃষিপণ্য। বিশেষ করে তুলা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। ফলে বাংলাদেশের বৃহত্তম রফতানি খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে ব্রাজিলের কৃষি অর্থনীতি।

 

আর্জেন্টিনাও কৃষিপণ্য রফতানি করে থাকে। তবে বাংলাদেশের বাজারে তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত। দেশটি মূলত অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, শস্য ও কিছু কৃষিজাত পণ্য রফতানি করে।

 

অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিফলন

 

বাণিজ্যে ব্রাজিলের এগিয়ে থাকার পেছনে অন্যতম কারণ দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা।

 

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী দেশ ব্রাজিল বর্তমানে বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম অর্থনীতি। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর)-এর ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিল ২০২৬’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির অর্থনীতির আকার ছিল প্রায় ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার।

 

অপরদিকে আর্জেন্টিনা বিশ্বের ২৫তম বৃহত্তম অর্থনীতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা সংকট ও আর্থিক অস্থিরতার মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণেও কিছুটা চাপের মধ্যে রয়েছে দেশটি।

 

রফতানিতেও ব্রাজিল এগিয়ে

 

শুধু আমদানিতেই নয়, রফতানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের জন্য বড় বাজার হয়ে উঠছে ব্রাজিল।

 

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্রাজিলে ১৮৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। আগের বছরের তুলনায় রফতানি বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। যদিও বাংলাদেশের রফতানি গন্তব্য হিসেবে দেশটির অবস্থান ২৭তম, তবুও প্রবৃদ্ধির ধারা ব্যবসায়ীদের আশাবাদী করে তুলছে।

 

ব্রাজিলে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, জার্সি, পুলওভার, শার্ট, ট্রাউজার এবং অন্যান্য নিটওয়্যার পণ্য।

 

অপরদিকে আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশের রফতানি মাত্র ২১ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার। মোট রফতানি আয়ের হিসাবে যার অংশ মাত্র দশমিক ০৪ শতাংশ। বাংলাদেশের রফতানি গন্তব্যের তালিকায় দেশটির অবস্থান ৬৫তম। অর্থাৎ আর্জেন্টিনার তুলনায় ব্রাজিলে বাংলাদেশ প্রায় আটগুণ বেশি পণ্য রফতানি করছে।

 

ফুটবলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বাণিজ্যে অংশীদারত্ব

 

বাংলাদেশের মানুষ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে ফুটবল মাঠের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতায় চিত্রটি ভিন্ন।

 

দক্ষিণ আমেরিকার এই দুই দেশ একে অপরেরও বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে তারা আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট মারকোসুরের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

 

অবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটির (ওইসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ব্রাজিল আর্জেন্টিনায় প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল গাড়ি, মোটরযানের যন্ত্রাংশ এবং পণ্যবাহী ট্রাক।

 

একই সময়ে আর্জেন্টিনা ব্রাজিলে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। তাদের প্রধান রফতানি পণ্যের মধ্যে ছিল ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং গম।

 

দুই দেশের পারস্পরিক বাণিজ্যের এই পরিমাণ দেখায় যে, মাঠে যতই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকুক, অর্থনীতিতে তারা একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

 

বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?

 

বাংলাদেশের জন্য ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ বাজার। তবে বর্তমান বাস্তবতায় ব্রাজিলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেক বেশি শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময়। কৃষিপণ্য আমদানির পাশাপাশি তৈরি পোশাক রফতানির বাজার হিসেবেও দেশটির গুরুত্ব বাড়ছে।

 

অপরদিকে আর্জেন্টিনার বাজার এখনো তুলনামূলক ছোট হলেও সেখানে রফতানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

 

ফুটবলের উন্মাদনায় বাংলাদেশের মানুষ হয়তো দুই শিবিরে বিভক্ত। কেউ মেসির সমর্থক, কেউ নেইমারের। কিন্তু অর্থনীতির স্কোরবোর্ডে এখন পর্যন্ত ফলাফল একপেশে। সেখানে আর্জেন্টিনাকে অনেকটাই পিছনে ফেলে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ব্রাজিল।

 

ফুটবলের বিশ্বকাপের ট্রফি কে জিতবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের বিশ্বকাপে আপাতত বিজয়ীর নাম— ব্রাজিল।

০ মন্তব্য

You may also like

মতামত দিন