Home » নেপালে ভয়াবহ বন্যা ‘আমি আমার জীবনসঙ্গীর হাত ধরে রেখেছিলাম, কিন্তু স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল’

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ‘আমি আমার জীবনসঙ্গীর হাত ধরে রেখেছিলাম, কিন্তু স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল’

কর্তৃক xVS2UqarHx07
23 ভিউজ

‘কাদা আর পানির বিশাল স্রোত আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। আমি আমার জীবনসঙ্গীর হাত ধরে তাকে ছাদে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু চোখের সামনেই কাদার স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।’

 

 

৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বারালের কণ্ঠে তখনো সেই মুহূর্তের আতঙ্ক। প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন তিনি, কিন্তু ভয়াবহ সেই দুর্যোগ কেড়ে নিয়েছে তার জীবনসঙ্গীকে। স্ত্রীকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টাটুকুও করতে পারেননি তিনি।

 

কেশব বলেন, চার-পাঁচ ঘণ্টা পর হেলিকপ্টারে করে আমাকে উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও তার অপেক্ষা শেষ হয়নি। কারণ স্ত্রী তখনো কাদার নিচে। শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝতে পারেন, প্রিয় মানুষটি আর ফিরবেন না।

 

 

কেশব একা নন। ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মুহূর্তেই বদলে গেছে শত শত মানুষের জীবন। কেউ চোখের সামনে ঘরবাড়ি ভেঙে পড়তে দেখেছেন, কেউ প্রাণ বাঁচাতে আঁকড়ে ধরেছেন গাছের ডাল।

 

বেঁচে যাওয়া আরেক ব্যক্তি জানান, কাজ করার সময় তিনি যে বাড়িতে ছিলেন, সেটি তার চোখের সামনেই ধসে পড়ে। চারপাশে তখন কাদা, পানি আর ধ্বংসস্তূপের তাণ্ডব। শেষ পর্যন্ত একটি আমগাছ আঁকড়ে ধরে প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

 

বুধবার (২৬ আগস্ট) নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর বৃহস্পতিবারও শত শত নিখোঁজ মানুষের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে। নদীতে মাটি ও পাথরের বিশাল স্তূপ ধসে পড়ার পর আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। মুহূর্তেই পাহাড়ি শহর ও উপত্যকাগুলো পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। প্রাণ হারান বহু মানুষ।

 

 

নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজ ৪০০ জনের বেশি পর্যটকের মধ্যে প্রায় ৩৪০ জন বিদেশি। ট্রেকিং ও তীর্থযাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় এই পার্বত্য এলাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত পর্যন্ত ১৬০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

 

সীমান্ত এলাকায় বন্যার পানির সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের ভয়াবহ স্রোতে মানুষকে ভেসে যেতে দেখা গেছে বিভিন্ন যাচাইকৃত ভিডিওতে। চোখের সামনে এমন দৃশ্য দেখার পরও যারা প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন, তাদের কাছে দুর্যোগের সেই কয়েক ঘণ্টা যেন এক দুঃস্বপ্ন।

 

 

নেপাল ও চীনের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এই দুর্যোগে ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে।

 

নেপালে পানির তোড়ে ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের অবকাঠামো। অন্যদিকে তিব্বতের গিরং কাউন্টির একটি সীমান্ত স্থলবন্দরে ভূমিধসের পর বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন চীনা কর্মকর্তারা।

 

দুর্যোগের পর নেপালের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিলেন, ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে গিয়ে বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।

 

 

তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, দুর্যোগের সময় যে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড হওয়ার কথা বলা হয়েছিল, সেটি প্রকৃত ভূমিকম্প ছিল না। হিমবাহের পাথর ও বরফ ধসে পড়া এবং সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকেই ওই ভূকম্পনজনিত শক্তি তৈরি হয়েছিল।

 

নিখোঁজদের অনেকেই ছিলেন তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবরের তীর্থযাত্রী। হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর কাছে দুর্গম উচ্চভূমিতে অবস্থিত এই স্থান পবিত্র হিসেবে বিবেচিত।

 

 

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, কৈলাস পর্বত ভগবান শিবের আবাসস্থল। মানস সরোবর হ্রদের তীরে অবস্থিত এই পর্বত শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণেই নয়, বহু মানুষের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানও।

 

নেপাল পর্যটন বোর্ডের মুখপাত্র সুনীল শর্মা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ৪৭ জন যুক্তরাষ্ট্রের, ৩৪ জন অস্ট্রেলিয়ার, ৩৩ জন যুক্তরাজ্যের এবং ২৪ জন কানাডার নাগরিক।

 

সূত্র : রয়টার্স

০ মন্তব্য

You may also like

মতামত দিন