ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের ১০০ দিন পার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। একই সময়ে প্রথমবারের মতো সংসদে বিরোধীদলের ভূমিকায় রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এই সময়ে সংসদে ও সংসদের বাইরে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা, ওয়াকআউট, বিবৃতি এবং নানা ইস্যুতে অবস্থান তুলে ধরলেও বড় কোনো সংঘাতমুখী কর্মসূচিতে যায়নি দল দুটি। ১০০ দিনে বিরোধীদল হিসেবে জামায়াত-এনসিপির ভূমিকা, অবস্থান ও রাজনৈতিক কৌশল কেমন ছিল, তা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের একদিন আগেই জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সাক্ষাতের পরপরই জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিরোধীদল হিসেবে তাদের ভূমিকা কেমন হবে, সে বিষয়ে বার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে আমরা নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করবো। তবে একটি আদর্শিক বিরোধীদল হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আমরা আপসহীন থাকবো।’
জামায়াতের আমির আরও বলেন, ‘সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজে আমাদের সমর্থন থাকবে। কিন্তু যেখানেই জবাবদিহির প্রয়োজন হবে, সেখানে আমরা সোচ্চার থাকবো। আমাদের উদ্দেশ্য সংঘাত নয়, বরং সংশোধন; বাধা দেওয়া নয়, বরং পর্যবেক্ষণ। দেশের মানুষ এমন একটি সংসদ প্রত্যাশা করে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে।’
তবে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর পর থেকেই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে দ্বিমত পোষণ এবং তিনবার ওয়াকআউট করে বিরোধীদল হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে জামায়াত-এনসিপি।
এছাড়া সরকার গঠনের পর দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, খুন-ধর্ষণ, মব সৃষ্টি করে হামলাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিবৃতি দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে বিরোধীদল। সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ, জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগে সরকারের দলীয়করণেরও সমালোচনা করেছে তারা।
বিরোধীদল হিসেবে কেমন ছিল জামায়াতের ১০০ দিন
১০০ দিনে বিরোধীদল হিসেবে কী ভূমিকা পালন করেছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি, সরকারের ভালো কাজে সহযোগিতা করবো, মন্দ কাজে সমালোচনা করবো এবং সরকারের ভুল পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবো। তাই করছি।’
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সরকার সবচেয়ে বড় ইভেন্ট গণভোটকে অস্বীকার করেছে। আমাদের দৃষ্টিতে এটা সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। তারা গণভোটের ফলাফল অস্বীকার করে দ্বিমুখী আচরণ করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই তা অকপটে স্বীকার করেছেন। নির্বাচনের আগে কিন্তু তারেক রহমান নিজেও গণভোটের পক্ষে ছিলেন।’
জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, ‘বর্তমানে সরকার জুলাই সনদ অস্বীকার করছে। গুম কমিশন ও বিচার বিভাগীয় সচিবালয়, যা তারা বিলুপ্ত করেছে; এসব কিছুর ফল তাদের ভোগ করতে হবে। সারা দেশে আইনশৃঙ্খলার যে ব্যাপক অবনতি ঘটেছে, সেদিকে তাদের নজর নেই। রাজধানীসহ দেশজুড়ে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজিতে যুক্ত। সাধারণ মানুষ এসব চাঁদাবাজদের ওপর ত্যক্ত-বিরক্ত।’
দলীয়করণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের প্রশাসক থেকে শুরু করে সারা দেশে জেলা প্রশাসক নিয়োগে সরকার দলীয়করণ করেছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও দলীয়ভাবে ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। হিসেব করলে তো আমরাও কিছু ভাগ পেতাম। কিন্তু আমরা তা চাইনি। আমরা চেয়েছিলাম যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, সরকার নিজেদের লোক ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পায়নি।’
ভবিষ্যতে বিরোধীদল হিসেবে জামায়াতের অবস্থান কী হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আগামী দিনে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে মাঠে নামার পরিকল্পনা আছে। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে, জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে অতীতেও কেউ টিকতে পারেনি। ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না, যার কারণে তাদের কর্মফল ভোগ করতে হয়।’
বিরোধীদল হিসেবে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালনের দাবি এনসিপির
বিরোধীদল হিসেবে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করার দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘বিরোধীদল হিসেবে যা করণীয়, আমরা আমাদের সর্বোচ্চটুকু করছি। বাকিটা জনগণ বলে দেবে আমরা কতটুকু করছি। আমরা কখনও সরকারের ভুল পদক্ষেপের সঙ্গে একমত হইনি; বরং সেগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরেছি। সরকারের যেকোনো অন্যায় বা অসংগতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রতিবাদ জানিয়েছি।’
সংসদে নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। হান্নান মাসউদ বলেন, ‘সংসদে যেহেতু আমরা নতুন, সে হিসেবে আমাদের কিছুটা অনভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে আমরা সেসব বিষয় একপাশে রেখে দেশ ও জাতির স্বার্থে যা কল্যাণকর, তাই করার চেষ্টা করছি।’
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। তারা শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। বিএনপি আর আগের বিএনপি নেই। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে তারা ক্ষমতায় গিয়ে সেই জনগণের রায়কেই অস্বীকার করছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি; এসব নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ।’
বিরোধীদলের কার্যকলাপ নিয়ে অসন্তুষ্ট নন বিশ্লেষকেরা
বিরোধীদলের ১০০ দিনের কার্যকলাপ নিয়ে তেমন অসন্তোষ প্রকাশ করেনি সুশীল সমাজ। তবে তাদের ‘কুসুম কুসুম’ বিরোধিতার বিষয়টি অনেকের কাছেই স্পষ্ট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, জামায়াত এই মুহূর্তে সরকারের সঙ্গে বড় কোনো সংঘাতে যেতে চাইছে না। বরং সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে চলার চেষ্টা করছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে (সকালই দিনের পূর্বাভাস দেয়)। বিরোধীদল এ পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে গুরুতর সংঘাতে যাওয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করছে বলেই মনে হয়েছে। আমি জানি না এটা ভালো না খারাপ। তবে আমার মনে হয়, সরকার ও বিরোধীদল একত্রে আমরা যে সংকটের মধ্যে আছি, তা থেকে উত্তরণের উপায় বের করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি সংসদ কখনও চটকদার বক্তৃতায় সফল হয় না। সংসদ তখনই সফল হবে, যখন সবাই সম্মিলিতভাবে সমস্যা সমাধানের জন্য একে অপরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে। কারণ বিরোধীদলও সরকারের অংশ। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তাদের সঙ্গে নিয়ে সরকার কাজ না করলে অনেক ক্ষেত্রে সফলতা আসে না। তাছাড়া এ পর্যন্ত বিরোধীদল দায়িত্বহীন ভূমিকা পালন করছে বলেও আমার মনে হয় না।’
